\"ঘুড্ডি\" গল্পটি একটি আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী ছোট গল্প। আয়ান তার বাবার চাকরির কারণে পাহাড়ি শহরে চলে আসে এবং নতুন পরিবেশে তার জীবন কেমনভাবে বদলে যায়, বন্ধুত্বের সূত্রে নতুন আনন্দ ও ঘুড্ডি উড়ানোর মজা, এবং হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা—সব কিছুই পাঠককে আবেগের ভিন্ন মাত্রা দেখায়। গল্পটি মূলত শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা হলেও বড়রা পড়েও এর আবহ, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং বন্ধুত্বের গভীরতা উপভোগ করতে পারবেন।
ঘুড্ডি ✍ তুষার | পাহাড়ের গল্প, বন্ধুত্ব ও স্বপ্ন
ঘুড্ডি ✍️ লেখক: তুষার আয়ানের বাবা চাকরির কারণে পরিবারকে পাহাড়ি শহরে নিয়ে আসে। শহরটি ছোট, চারপাশে সবুজ পাহাড়, নদী এবং ঝর্ণা। আকাশ উজ্জ্বল, দূরে মেঘের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। আয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়—ছোট ছোট ঘর, বাঁকানো রাস্তা, পাহাড়ের ঢালু পথ। গাড়ি থেকে নামতেই সে বুঝতে পারে, এখানকার জীবন একেবারে অন্যরকম। মাটিতে পা রাখতেই মনে হয়—পাহাড়ের ঢালে দৌড়ালে মেঘের সঙ্গে হাত মেলানো সম্ভব। বাবা অফিসে চলে গেলে আয়ান উঠোনে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছে—ঝর্ণার জল, বাতাসে ভেসে আসা পাইন গাছের গন্ধ। সে হাঁটে, দৌড়ায়, পাহাড়ের খোলা জায়গা পরীক্ষা করে। আয়ান মনে করে, এখানকার জীবন আগের চেয়ে ভিন্ন। পরের দিন স্কুলের প্রথম দিন। পাহাড়ের ঢালু রাস্তা পার হয়ে আয়ান স্কুলে পৌঁছায়। স্কুলটি ছোট, তবে খেলার মাঠ আছে। ক্লাসে ঢুকতেই সবাই তাকাল। আয়ান লাজুক, কিছু বলতে পারছে না। হঠাৎ রুদ্র তার কাছে আসে। সাহসী ও বন্ধুত্বপূর্ণ রুদ্র আয়ানের সঙ্গে পরিচয় হয়। বিকেলে তারা একে অপরকে পাহাড়ের ঢালে ঘুড্ডি উড়ানোর জায়গা দেখায়। দু’জনে ঘুড্ডি বানায়—কাগজ কেটে, বাঁশ বাঁধে, সুতা বেঁধে। আয়ান প্রথমবার বানাচ্ছে, রুদ্র সাহায্য করে। তারা প্রস্তুত হয় পরের দিনের ঘুড্ডি উড়ানোর জন্য। স্কুলের ছুটি শেষে তারা পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে। সূর্য ধীরে ধীরে নেমে আসে, ঘাসে শিশির জমে। রুদ্র বলে, “চলো, কাল আমরা মেঘের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করব।” আয়ান ও রুদ্র একে অপরের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়। স্কুলের খেলার মাঠ, পাহাড়ের ঢাল—সব জায়গায় তারা একসাথে থাকে। ছোট ছোট প্রতিযোগিতা—কে আগে ঘুড্ডি উড়াবে, কে মেঘের কাছে পৌঁছাবে। প্রতিদিন তারা নতুন কৌশল শেখে, পাহাড়ের ঢালে বসে আকাশের দিকে তাকায়, স্বপ্ন দেখে। বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে দৃঢ় হয়। বসন্তের সকালে তারা বাজারে গিয়ে ঘুড্ডি বানানোর উপকরণ কিনে আনে। আয়ান সাদা, রুদ্র লাল ঘুড্ডি বানায়। কাগজ কেটে, বাঁশ বেঁধে, আঠা মাখিয়ে দু’জনে ঘুড্ডি তৈরি করে। বিকেলে পাহাড়ের ঢালে বসে উড়ানোর চেষ্টা করে। ঘুড্ডি বাতাসে দুলছে, মেঘের সঙ্গে খেলছে। ঘুড্ডি উড়ানোর আগের রাত আয়ান এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে—সাদা ঘুড্ডি উপরে উড়ছে, সে দৌড়াচ্ছে, কিন্তু মাটি স্পর্শ করছে না। বাবা সতর্ক করে—পাহাড়ে সাবধানে থাকতে। পরের দিন সকালে আয়ান এবং রুদ্র পাহাড়ের চূড়ায় যায়। আকাশ পরিষ্কার, বাতাস হালকা। রুদ্র লাল ঘুড্ডি উড়ায়, আয়ান সাদা। হঠাৎ সাদা ঘুড্ডি দ্রুত উপরে উঠে যায়। আয়ান চমকে যায়, দৌড়াতে শুরু করে। পাহাড়ের ঢালু পথে তার পা ঠিকমতো ধরে না। ভারসাম্য হারিয়ে সে পড়ে যায়। রুদ্র ছুটে আসে, চেষ্টা করে ধরে রাখার, কিন্তু সময় কম। আয়ান এবং তার ঘুড্ডি একসাথে উপরে চলে যায়। পাহাড়ের নিচে লোকজন ছুটে আসে। আয়ানের বাবা-মা দৌড়ে আসে। আয়ানকে খুঁজে পায়, কিন্তু সে মৃত। সব কিছু থেমে যায়। সাদা ঘুড্ডি বাতাসে দুলছে। রুদ্র বোঝে, ঘুড্ডি এবং আয়ান একই পথে চলে গেছে। আয়ানের বাবা একা। ছেলে হারানোর শোকে স্তব্ধ। ঘর ফাঁকা, স্মৃতি ভেসে বেড়ায়—খেলনা, বই, কাপড় সবকিছু ছেলের কথা মনে করিয়ে দেয়। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে, পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। রুদ্র নিজেকে দোষী মনে করে। যদি সে আরও সাবধানে হতো, আয়ান বাঁচতে পারত।
0 Comments